স্বাধীনতা ঘোষণার ভিত্তি ১০ এপ্রিল

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক কে? এ নিয়ে বিগত প্রায় তিন যুগের তর্ক-বিতর্কে স্বাধীনতা ঘোষণার বৈধতার মূল কথাই সব চেয়ে কম আলোচিত হয়েছে। ফলে এসব বিতর্ক গ্রাম্য ঝগড়ার স্তরেই থেকে গেছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত আদালতের একটি রায় থাকার পরও এবারের ২৬ মার্চ উপলক্ষ্যে প্রধান প্রধান পত্রিকাতেও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে সব কলাম ছাপা হয়েছে তাতে স্পষ্ট ওই আলোচনা এখনও চলমান। ‘কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা’ শিরোনামে প্রথম আলোয় যে লেখাটি ছাপা হয়েছে তাতে শোভা পাচ্ছে শুধু জিয়ার ছবি! আদতে স্বাধীনতার ঘোষকের তালাশ একটি ভুল সুড়ঙ্গে ঘুরে মরছে। সবার আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য কে কবে কী বক্তব্য দিলেন না দিলেন ইত্যাদি।
‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ ধারণাটি কী সে বিষয়ে অস্বচ্ছতার কারণেই এমনটি ঘটে চলেছে। বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালে গৃহীত হয়। নানা পালাবদল হলেও এই সংবিধানই ধারাবাহিকভাবে শাসনের মূল বিধান হিসেবে রয়েছে। এই সংবিধান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কারা? পাকিস্তানের সংবিধান রচনার উদ্দেশ্যে ’৭০ এর নির্বাচন খ্যাত নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এই সংবিধান প্রতিষ্ঠা করেন। ’৭১ এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনা বাহিনী গণহত্যায় নামলে পালিয়ে ভারতে গিয়ে এই সাংসদরা গণপরিষদ গঠন করে একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেন। ’৭১ এর ১০ এপ্রিল এটি গৃহিত হয়। ’৭২ এর সংবিধান এই ১০ এপ্রিলে গৃহিত স্বাধীতার ঘোষণাপত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। লক্ষণীয়, মার্চে পাকিস্তানি শাসকরা গণপরিষদ অধিবেশন স্থগিত করে তেমনই পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে। ৭ মার্চে তার ভাষণে বেতন প্রদানের মতো খুঁটিনাটি বিষয়ে বক্তব্যে স্পষ্ট যে কার্যত তারই শাসন চালু হয়ে গিয়েছিল এই বাংলায়।
৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে এটি খুবই পরিষ্কার গণপরিষদ তারা ত্যাগ করছেন না। ভোটের বাক্সে লাথি মারার মতো কোনো হঠকারী পথ তারা নেননি। ভাষণে তিনি বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের একজনও যদি কোনো ন্যায্য কথা বলে তা তিনি মেনে নেবেন। আবার বলেন- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এ দুটো কথায় পাকিস্তান অখণ্ড থাকা বা দ্বিখণ্ডিত হওয়ার চাইতে মূখ্য হয়ে ওঠে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শাসন কায়েম করার অভিপ্রায় যেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙালি জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব এরই মধ্যে কায়েম হয়ে গেছে। শুধু দেশেই নয় তাবৎ বিশ্বেই অধিকারের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় যেটি সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শক্তি কেন্দ্র। তবে এই ভাষণ কোনো স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না। বরং স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার মতো সংকট তৈরির ব্যাখ্যাসহ ঘোষণাদানের ন্যায্য অধিকার সেদিন এই ভাষণের বক্তব্যে পাওয়া যায়।
২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় গণহত্যা শুরু হলে সারা দেশেই সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু স্বগৃহ থেকে গ্রেপ্তার হন। আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারা যে যার মতো করে পালিয়ে ভারতে পাড়ি দেন। সেখানে ’৭০ নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মিলিত হন। ১০ এপ্রিল তারা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি গ্রহণ করেন। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরে পালন করেন আনুষ্ঠানিকতা।
এই ঘোষণাপত্রে নির্বাচিত সাংসদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানি শাসকদের গণহত্যা শুরু করার প্রসঙ্গ সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। ওতে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানে তাদের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠাও করা হয়। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণার বৈধতা প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা ছিল জনপ্রতিনিধিদের হাতে। ঘোষণায় বলা হয়েছে- তারা জনগণের বৈধ সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধি, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার জনগণের নেতা। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, নেতা নির্বাচন, স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি সব কিছুই একে একে উল্লেখ করা হয় এই ঘোষণাপত্রে।
তাদের এই ঘোষণাটি সাংবিধানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার হতে পারতো যদি না তারা সেখানে উল্লেখ করতেন, ‘এরা আগেই ২৬ মার্চ ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।’ অর্থাৎ তারা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত করছেন ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন কী দেননি না স্বীকার বা অস্বীকার করার ক্ষমতা শুধুই ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর বর্তায়। খুব রুঢ়ভাবে বললে বলতে হয়– ১০ এপ্রিলের এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি বাতিল করার ক্ষমতা শুধুমাত্র ’৭০এর নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদদেরই ছিল। নির্বাচিত সাংসদরাও যেমন এই ঘোষণার বিরুদ্ধে দাঁড়াননি, তেমনই বঙ্গবন্ধুও কোনো অস্বীকৃতি জানাননি।
এমন কোনো রীতি বা বিধান নেই যে স্বাধীনতার ঘোষণা রেডিও, টেলিভিশন অথবা জনসম্মুখে দিতে হবে। একটি স্বীকৃত স্বাধীনতার ঘোষণার মৌলিক বিষয়টি হচ্ছে এর ঘোষকের এ কাজের কর্তৃত্ব। সেই কর্তৃত্ব প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতারা সঠিকভাবেই ধারাবাহিকতাসহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সে সময়ের পার্লামেন্ট যখন নিশ্চিত করে যে শেখ মুজিব ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তখন আর চট্টগ্রামে শেখ মুজিব যে ঘোষণাটি পাঠান সেটি আর মূখ্য কিছু থাকে না। তাই চট্টগ্রামের বেতার থেকে নানা জনের স্বাধীনতার ঘোষণা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র প্রতিরোধের মতোই উদ্দিপনা সৃষ্টির মতো ইতিহাসের এক একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা মাত্র। সেগুলোর কোনোটিই স্বাধীনতার ঘোষণা নয়। ফলে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাটি কীভাবে চট্টগ্রামে গেল সেটি প্রমাণে বা অপ্রমাণে বিগত দিনের শ্রম নিয়োগ ছিল অর্থহীন।
এই ঘোষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ব্যক্তি মুজিব বা আওয়ামী লীগ নেতা মুজিব নন বরং জনপ্রতিনিধিদের মনোনীত নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণাটি গৃহীত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে প্রবাসী গণপরিষদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটির বৈধতা প্রদানে সুচিন্তিত পন্থাই অনুসরণ করা হয়েছিল সেদিন। ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণার ওপর আন্তর্জাতিক আদালতের মতামতটি লক্ষ্য করলে এটি স্পষ্ট হয়। যেখানে আন্তর্জাতিক আদালতের দীর্ঘ মতামতে ঘোষকের কর্তৃত্বের ওপর আলোকপাত করতে দেখা যায়। ওরাও স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে গিয়ে জনগণের প্রতিনিধি বলে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
স্বাধীনতার ঘোষণা বিতর্কে বিএনপি ও তার সমমনারা দাবি করেন মেজর জিয়া নিজেকে সরকার প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। অন্যরা বলেন, জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন। প্রথম আলোর উল্লেখিত প্রবন্ধে বলা হয়েছে– জিয়া নিজেকে Provisional head of the Swadhin Bangla Liberation Government হিসেবে ঘোষণা দেন।
যিনি নিজেকে সরকারপ্রধান হিসেবে দাবি করে ঘোষণা দিলেন তিনিই আবার মুজিবনগর সরকার গঠনের পর সেই সরকারের একজন সেনা কর্মকর্তার চাকুরে হলেন! তবে কী নিজের ঘোষণাটির মর্মার্থ অনুধাবন করতে অপারগ ছিলেন জিয়া? নাকি এটিকে তার মুজিবনগর সরকারের কাছে আত্মসমর্পন হিসেবে বিবেচনা করা হবে? যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা প্রধানও হতে পারলেন না তারই নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে গলা ফাটানো কেন!
কোনো দেশের ক্রান্তিকালে একাধিক রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় নামতে পারে। অনির্বাচিত রাজনৈতিক শক্তিও ক্ষমতা দখলে এগিয়ে আসতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাবশালী ঘটনাই ঘটেনি।
কসোভোর ওই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে মতামতে আন্তর্জাতিক আদালত বলছে, বিগত কয়েক শতকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে যতগুলো অঞ্চল থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ততগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়নি। মূল কথাটি স্বাধীনতা অর্জন করা। মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। রাষ্ট্র গঠনে তারা ব্যর্থ হলে তাদের ১০ এপ্রিলের ঘোষণাটি যেমন মূল্যহীন হতো বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন বলে তাদের দাবিটিও অর্থহীন হয়ে পড়তো।
এমন প্রশ্নও ওঠে– পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বাংলাদেশের সংবিধান রচনার বৈধতা কোথায়? স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার, যুদ্ধ করার, দেশ স্বাধীন করার এখতিয়ার যদি এই সাংসদের থাকে তবে সংবিধান রচনার কর্তৃত্ব থাকবে না কেন? কসোভোর স্বাধীনতার ঘোষণা যদি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘণ না হয়ে থাকে তবে মুজিবনগর সরকারের ঘোষণাও তার ব্যতিক্রম নয়। যদিও পাকিস্তান স্বাধীন হবার পর ইস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি কাদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। দেশভাগের পর যে অংশটুকু নিয়ে পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয় সে অঞ্চল থেকে নির্বাচিত বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি ও আসাম লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি এই দুই অ্যালেম্বলির জনপ্রতিনিধিদের নিয়েই সেদিন এই নতুন দেশের অ্যাসেম্বলি গঠন করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধুর ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যারা অস্বীকার করেন তাদের বলি– ইতিহাসে কারো অবদান স্বীকার করলেই তার রাজত্ব চিরস্থায়ী হয় না। মহাত্মা গান্ধী ও জিন্নার ছবি তাদের নিজ নিজ দেশে মর্যাদার সঙ্গেই টাঙানো রয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার বা মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত একটি ঘোষণাপত্র। যতদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছে ততদিন মুজিবনগর সরকার পরিচালনার অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে এই ঘোষণাপত্র কার্যকর ছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পরও এই ঘোষণাপত্র সংবিধান হিসেবে কার্যকর ছিল। ১৯৭২ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর তারিখে যখন দেশের নতুন সংবিধান প্রণীত হয় তখন সংবিধান হিসেবে এর কার্যকারিতার সমাপ্তি ঘটে।
ইতিহাস[সম্পাদনা]
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ঢাকা এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যার প্রাক্কালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। ৩০ মার্চের মধ্যেই তাদের অনেকে কলকাতায় সমবেত হন। প্রাদেশিক পরিষদের যে সকল সদস্য ১০ এপ্রিলের মধ্যে কলকাতায় পৌছতে সক্ষম হন তাদের নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন। তার নির্দেশেই অধ্যাপক রেহমান সোবহান আরো কয়েকজনের সাহায্য নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের একটি খসড়া প্রণয়ন করেন[১]।এরপর ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম এই ঘোষণাপত্রের আইনগত দিকগুলো সংশোধন করে একে পূর্ণতা দান করেন[২]। এই ঘোষণাপত্রটি প্রথমে ১০ এপ্রিল মুজিবনগর থেকে প্রচার করা হয়[৩]।এরপর আবার ১৭ এপ্রিল তারিখে মেহেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী স্থান বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তী নাম মুজিবনগর) এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে গণপরিষদের সদস্য অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন[৪]। এই ঘোষণার মাধ্যমে নবগঠিত প্রবাসী আইন পরিষদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে সাথে সাথে এ ঘোষণাপত্র প্রবাসী সরকারের অবস্থান ও যৌক্তিকতা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে[৫]। এদিনই ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়া হয় এবং একই সাথে ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কার্যকর হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারও বৈধ বলে স্বীকৃত হয়। এ ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকলের মধ্যে চেইন অফ কমান্ড স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়।
ঘোষণাপত্রের পূর্ণ বিবরণ[সম্পাদনা]
| বাংলাদেশ গণপরিষদ দ্বারা ঘোষণা[৬] |
|---|
| স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র
যেহেতু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল;
এবং
যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল;
এবং
যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান করেন;
এবং
যেহেতু তিনি আহূত এই অধিবেশন স্বেচ্ছাচার এবং বেআইনীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন;
এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পারষ্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন;
এবং
যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান;
এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনা করেছে এবং এখনও বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতন চালাচ্ছে;
এবং
যেহেতু পাকিস্তান সরকার অন্যায় যুদ্ধ ও গণহত্য এবং নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার পরিচালনার দ্বারা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের পক্ষে একত্রিত হয়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব করে তুলেছে;
এবং
যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর তাদের কার্যকরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে;
সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারষ্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে
বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি এবং এর দ্বারা পূর্বাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি; এবং
এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; এবং
রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী থাকবেন; এবং
তাঁর কর ধার্য ও অর্থব্যয়ের ক্ষমতা থাকবে; এবং
বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতারও তিনি অধিকারী হবেন।
বাংলাদেশের জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সকল দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন।
আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, বিশ্বের একটি জাতি হিসাবে এবং জাতিসংঘের সনদ মোতাবেক আমাদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তেছে তা যথাযথভাবে আমরা পালন করব।
আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য আমরা অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলীকে যথাযথভাবে রাষ্ট্রপ্রধান ও উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য দায়িত্ব অর্পণ ও নিযুক্ত করলাম।
স্বাক্ষর: অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলী বাংলাদেশ গণপরিষদের
ক্ষমতা দ্বারা এবং ক্ষমতাবলে যথাবিধি সর্বাধিক ক্ষমতাধিকারী। |
আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ ১৯৭১[সম্পাদনা]
বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে একই দিনে আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ নামে একটি আদেশ জারি করেন। ঘোষণাপত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা রক্ষার্থে এই আদেশ বলবৎ করা হয়[২]।
পূর্ণ বিবরণ[সম্পাদনা]
আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ ১৯৭১[৭]
মুজিবনগর, বাংলাদেশ, ১০ এপ্রিল ১৯৭১, শনিবার ১২ চৈত্র ১৩৭৭
আমি বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রপতি এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে এ আদেশ জারি করছি যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একইভাবে চালু থাকবে, তবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের জন্য করা যাবে। এই রাষ্ট্র গঠন বাংলাদেশের জনসাধারণের ইচ্ছায় হয়েছে। এক্ষণে, সকল সরকারি, সামরিক, বেসামরিক, বিচার বিভাগীয় এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী যারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছেন, তারা এতদিন পর্যন্ত নিয়োগবিধির আওতায় যে শর্তে কাজে বহাল ছিলেন, সেই একই শর্তে তারা চাকুরিতে বহাল থাকবেন। বাংলাদেশের সীমানায় অবস্থিত সকল জেলা জজ এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং সকল কূটনৈতিক প্রতিনিধি যারা অন্যত্র অবস্থান করছেন, তারা সকল সরকারি কর্মচারীকে স্ব স্ব এলাকায় আনুগত্যের শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করবেন।
এই আদেশ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর করা হয়েছে বলে গণ্য করতে হবে।
স্বাক্ষর:- সৈয়দ নজরুল ইসলাম
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি
তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]
- ↑ রেহমান সোবহান (১৯৯৮)। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ঃ একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য। মাওলা ব্রাদার্স। পৃষ্ঠা ১০৪–১০৫। আইএসবিএন 984-410-102-6।
- ↑ ক খ হোসেন তওফিক ইমাম (২০০৪)। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১। আগামী প্রকাশনী। আইএসবিএন 984-401-783-1।
- ↑ রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম (২০০৬)। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। অনন্যা প্রকাশনী। আইএসবিএন 984-412-033-0।
- ↑ শামসুল হুদা চৌধুরী (২০০১)। একাত্তরের রনাঙ্গন। আহমদ পাবলিশিং হাউস। আইএসবিএন 984-11-0505-0
|আইএসবিএন=এর মান পরীক্ষা করুন: checksum (সাহায্য)। অজানা প্যারামিটার|1=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - ↑ মঈদুল হাসান (২০০৪)। মূলধারা ৭১। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। আইএসবিএন 984 05 0121 6।
- ↑ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, তৃতীয় খন্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা, ১৯৮২, পৃষ্ঠা ৪।
- ↑ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, তৃতীয় খন্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা, ১৯৮২, পৃষ্ঠা ৬।
- বাংলাপিডিয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নিবন্ধ: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। লেখক: সাজাহান মিয়া।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন